স্বপ্ন আর আদর্শ নিয়ে বাঁচো- ১ম খন্ড
লেখক : আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারকআলোকিত মানুষ বলে সত্যি সত্যিই কি কিছু আছে? থাকুক না-থাকুক, আমার ধারণা, আলোকিত হওয়ার একটা স্বপ্ন চিরদিনই মানুষের মধ্যে রয়েছে। মানুষ চিরকালই আলোকিত হতে চায়। পরিপূর্ণভাবে কখনো আলোকিত হয় না, কিন্তু জীবনে আলোর পরিধি বাড়াতে চায়। এখন প্রশ্ন, এই আলো জিনিসটি কী? আলো এমনিতে একটা ফুটফুটে, অপরূপ জিনিস। দেখে মনে হবে কি পেলব, কি কমনীয়। কিন্তু বলো তো, এই আলোর জন্ম কোথায়? কোথা থেকে এ আসে? ভুলো না, আলোর জন্ম এক ভয়ঙ্কর ও সর্বগ্রাসী জিনিস থেকে যার চেয়ে ধ্বংসকারী আর কিছু নেই। এর নাম আগুন। অন্যকে সে কেবল ছাই করে না, নিজেকেও করে। আলোর জন্ম এই ভয়ংকর অগ্নিবিশ্ব থেকে। যতক্ষণ সে জ্বলে ততক্ষণ সে আলো দেয়, না জ্বললে না। তাই পৃথিবীতে সেই মানুষই আলোকিত হতে পারবে যে জ্বলছে, নিজেকে ছাই করছে। এই জ্বলাটা যার যত বেশি বা যত বড়ভাবে জ্বলছে, তার আলোও তত বেশি, যেমন প্রদীপের চেয়ে বেশি আলো সূর্যের। এই অগ্নিদাহের যন্ত্রণাই রূপ পায় সৌন্দর্যে। এখন বল একটা প্রদীপ বা মোমবাতির সত্যিকার সার্থকতা কিসে? স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে থাকায়, নাকি জ্বলে জ্বলে চারিদিক আলোকিত করায়? আলোকিত মানুষ হল সেই মানুষ, যে জ্বলে জ্বলে আলো বিলিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন, আলোকিত মানুষের ভেতরে যে আগুন তা কিসের আগুন? সে কি চুলো বা ফার্নেসের আগুন? না, তা নয়, এ এক মহৎ আগুন- ভালোবাসার আগুন, স্বপ্নের আগুন, সত্যের আগুন, প্রেমের আগুন। বেদনার, আদর্শের, আত্মোৎসর্গের আগুন। এই আগুন যত বেশি জ্বলে তত বেশি পৃথিবীকে আলোকিত করে।
এখন প্রশ্ন: মানুষ কি কখনো পরিপূর্ণভাবে আলোকিত হয়? না, হয় না। আমরা তো সারাক্ষণই দেখছি আমাদের মধ্যেই রয়েছে এমন এক নিষ্কৃতিহীন বিরুদ্ধশক্তি- এক অশুভ দানব-যা প্রতিমুহূর্তে আমাদের যাবতীয় শুভ উদ্যোগকে বিধ্বস্ত করে আমাদের সুখের স্বপ্নকে তছনছ করে দিচ্ছে। আমরা থাকতে চাইছি প্রেম আর শান্তির মধ্যে, কিন্তু ঐ অন্তর্গত শয়তান
আমাদের সব চেষ্টাকে প্রতি পদে ব্যর্থ করে আমাদের হতাশার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের ভেতরকার আলো ওই অন্ধকারের সাথে অবিশ্রাম যুদ্ধ করে। মাঝেমধ্যে সে পরাজিতও হয়, তবুও ফিরে ফিরে আক্রমণ করে তার সেই মৃত্যুহীন শত্রুকে হটিয়ে নিজের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার করে। তাই মানুষ কোনোদিন পরিপূর্ণ আলোকিত হয় না, কিন্তু নিজের ভেতরকার আলোর পরিধি বাড়িয়ে ঐ অপশক্তিকে দমিত রাখার চেষ্টা করে। আলোর জন্যে মানুষের এই চেষ্টার নামই আলোকিত হওয়া। এখন প্রশ্ন, আলোর পরিমাণ বাড়ানো যায় কীভাবে? কাঠের তৈরি খাট, টেবিল চেয়ার- এদের দেখে কেউ কি কোনোদিন বলবে এরা আগুন? না, কাঠকে কোনোদিন কেউ আগুন বলবে না। তবু কাঠ তো আগুনই। হয়তো নিষ্ক্রিয় বা সুপ্ত আগুন। কিন্তু আগুনের লেলিহান সম্ভাবনা আছে এর মধ্যে। ওর গায়ে আগুন লাগিয়ে দাও, দেখবে সে জ্বলছে। আমাদের প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে রয়েছে ঐ কাঠের মতো জ্বলে ওঠার সম্ভাবনা। কিন্তু শুধু নিজের ক্ষমতায় সবসময় আমরা জ্বলে উঠতে পারি না। জ্বলে উঠতে বাইরের সাহায্য লাগে। যদি কোনো দেশলাই বা মশালের শিখা আমাদের শরীরে-মনে আগুন লাগাতে পারে, আমরা জ্বলে উঠতে পারি। আমাদের ভেতরের আগুন বা আলোকে বাড়াতে পারি। কিছুতেই একশ ভাগ আমরা আলোকিত হব না, কিন্তু যার দশ আছে তার বিশ হবে, যার ত্রিশ আছে তার পঞ্চাশ হবে। একশ'র মধ্যে কেউ আশি পেলে আমরা যেমন ধরে নিই সে লেটার-মার্ক পেয়েছে, আলোর ব্যাপারেও তাই। আশি পেলেই ধরতে হবে সে একশ পেয়েছে।
এখন প্রশ্ন, আমাদের ভেতরকার এই আগুন বাড়াবো কী করে? একটা গল্প বলে ব্যাপারটা বোঝাই। আমাদের পাশের এক বস্তিতে একদিন আগুন লেগেছিল। কী যে সেই আগুনের তাণ্ডব আর তার লেলিহান শিখা! যেন গোটা আকাশকে গিলে খেয়ে ফেলবে! এখন বল, বস্তি কি আগুন? তা তো না। ও তো মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার ঘর। শান্ত, নিরীহ একটা এলাকা। তবু তারও মধ্যেও আছে দাউ দাউ আগুনের সম্ভাবনা। আগুনের একটা জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ যেদিন ওর গায়ে এসে লাগল, সেদিন কী ভয়ঙ্করভাবেই না সে জ্বলে উঠল। আসলে এ আগুন তার মধ্যেও ছিল, কিন্তু তা ছিল সুপ্ত। তাই নিজে জ্বলে উঠতে পারেনি। কিন্তু যেই জীবন্ত আগুন এসে তার হাতে হাত রাখল অমনি তার ভেতরকার আগুন পূর্ণ সহযোগিতা দিয়ে গোটা এলাকাকে লণ্ডভণ্ড করে দাবানল হয়ে উঠল। মানুষের জ্বলে উঠতেও লাগে সেই প্রজ্জ্বলন্ত শিখা, সেই দেয়াশলাই, সেই স্ফুলিঙ্গ, সেই মশাল। কিন্তু কোথায় সেই প্রজ্বলিত স্ফুলিঙ্গ যা এলে আমরা জ্বলে উঠি? এ আগুন আছে বিরল কিছু মানুষের মধ্যে। তাদের দিকে তাকালেই তুমি সেই আগুন-লাগা দাউ দাউ প্রাসাদটাকে দেখতে পাবে। এদের নাম প্রতিভা।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের কথা মনে পড়ে। রেসকোর্সের মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি বক্তৃতা করছিলেন। আমি বসেছিলাম মঞ্চের ঠিক সামনেই। চল্লিশ হাত দূর থেকে আমি তাকে দেখছিলাম। তাঁকে মনে হচ্ছিল যেন থেকে থেকে ফুঁসে উঠছে গর্জমান কোনো বলীয়ান সমুদ্র। এর আগে স্বাধীনতা নিয়ে মানুষের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু তাঁর সেই দুর্বার ভাষণে সারা জাতির হৃদয় যেন মশাল হয়ে জ্বলে উঠল। শুরু হল স্বাধীনতা যুদ্ধ। একজনের আগুন সারা জাতির ভেতরকার আগুনটাকে জ্বালিয়ে দিল। আমাদের সুহৃদ জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরীর কাছ থেকে একটা গল্প শুনেছিলাম। উনি তখন পাকিস্তানে। হয়তো সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন বা মেজর। যখন এই বক্তৃতা হচ্ছিল তখন রাওয়ালপিণ্ডি ক্যান্টনমেন্টের কোনো এক ঘরে জনাকয় পাকিস্তানি জেনারেল আর ব্রিগেডিয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে রেডিওতে তিনিও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনছিলেন। বক্তৃতা শেষ হলে একজন জেনারেল একজন ব্রিগেডিয়ারকে জিগ্যেস করলেন, 'আপনি কি বক্তৃতার কিছু বুঝলেন? ব্রিগেডিয়ার উত্তর দিলেন, বুঝিনি, শুধু বুঝলাম রেডিও সেটটা উথালপাতাল করছে। কেবল সেদিন না, আজ পর্যন্ত সেই বক্তৃতা শুনলে যে কারো রক্তে আগুন ধরে যায়। কেন হয় এমন? হয় এজন্যে যে, ঐ আগুনের হাজার গুণ আগুনের এক জ্বলন্ত বন্ধুৎসব ছিল ঐ মানুষটির মধ্যে। পৃথিবীর ক্ষণজন্মা মানুষদের মধ্যে থাকে এমনই দাউ দাউ আগুন। এর চেয়ে অনেক অনেক বেশি জ্যোতির্ময় আগুন ছিল হজরত মোহাম্মদ, গৌতমবুদ্ধ, যিশুখ্রীষ্টের মধ্যে। এমনি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। কিন্তু এই আগ্নেয়গিরি কি চিরদিন থাকে? একদিন তো এঁরা এঁদের অগ্ন্যুৎপাত শেষ করেন। এ্যারিস্টটল, প্লেটো, আলেকজান্ডার, কত বিশাল বিশাল নাম।
২য় খন্ড আসতেছে খুব শিগ্রই।